শুভ মহালয়া

শুভ মহালয়া

আমার এক বান্ধবী হোয়াটসঅ্যাপে কিছু ছবি পাঠালো কাল। রোববার ছুটির দিনে বিকেলবেলা হঠাৎ তার মন হয়েছে কুমোরটুলি যাবে। তার বর বড় অপিসের চাকুরে। সাথে সিঙ্গল মল্ট স্কচের মত ফোটোগ্রাফির নেশা আছে। খাসা একখান ক্যামেরাও আছে। আমাদের ভাষায় তার নাম সেমিপ্রো ডিএসএলআর। বরটিও এক কথায় রাজি। মিয়াবিবি বাইকবাহনে কাল হাজির হয়েছিলেন কুমোরটুলি। সে অভিসার এর কিছু গর্বিত ছবি সে আমায় পাঠালে কাল। এগুলি তার নিজের মোবাইলে তুলেছে সে। এবং আমায় দেখতে দিলে – কেমন হয়েছে দেখ তো – বলে। সাথে বললে এই প্রথম কুমোরটুলি গেলাম রে। কি দারুণ রে। অসাম!

আমি দেখলাম ছবিগুলোয় দুটো মিস্টি প্রজাপতি রঙবেরঙের ফুলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

আমি পেশায় স্থিরচিত্র শিক্ষক। ফলে ছাত্রছাত্রী ছাড়াও বন্ধুবান্ধব চেনাশোনা অনেকেই ছবি দেখান। উৎসাহী অনেকে জানতে চান কী কী ভুল হলো। অনেকেই খালি জিজ্ঞেস করেন ভালো হয়েছে তো?

এবং আমি ছবি দেখতে দেখতে যারপরনাই ক্লান্ত হয়ে পড়ি। তা ছাড়া হোয়াটসঅ্যাপ সংক্রান্ত ছবির যন্ত্রণা এখন আধুনিক জীবনের অঙ্গ বলে মেনে নিতে হয়েছে। এবং সোশ্যাল মিডিয়া দি বস্‌ এর ছবির দাপট সহ্য করে কোনমতে বেঁচে আছি। অনেকটা মাল্টিপল অর্গান ফেলিওর দশা আর কি। তার ওপর ফোটোগ্রাফির দুনিয়ার সঙ্গে কোনভাবে সামান্য যুক্ত যে কোন ব্যক্তিমাত্রেই জানেন এসময় কুমোরটুলি নামটা কী অতিমাত্রায় ভয়ঙ্কর।

তবে এ ছবিগুলো আনকোরা চোখে তোলা। ভালোবেসে একজন সাধারণ মানুষের দেখা। তথাকথিত ফোটোগ্রাফি শিল্পের সঙ্গে তেমন কোন সম্পর্ক নেই। তাই কি ভালো লাগলো বেশি? ভাবনাটায় কেমন শিউরে উঠলাম হঠাৎ! আজকাল আমারও কেমন যেন মনে শিক্ষার তেমন জরুরৎ সত্যিই নেই বোধহয়। রাখালিয়া বাঁশিই একমাত্র পথ। শিক্ষকের পক্ষে কোন নির্দিষ্ট পথকে মোক্ষ মেনে নেওয়া আত্মহত্যার সামিল।

কিন্তু পুজোয় হাওয়ায় একটা খুশির আমেজ আছে। আর ছবিগুলোয় পড়ে আছে কাঁচা মনের রঙ। একটা নস্টালজিয়ার মত।

আমি গ্রামের ছেলে। ভারি সুন্দর একটা গ্রাম। যখন ছবি তুলতে শুরু করি তখন যেন মনে হয় প্রাণভরে জড়িয়ে ধরতে পেরেছিলাম গ্রামটাকে। যা ছবির আগে তেমন করে পারিনি হয়ত। স্থিরচিত্রের এক মনোযোগী ছাত্র তখন আমি। মাধ্যমটাকে বুঝতে চাইছি প্রাণপণে। পুজো আসছে। গ্রামের পরতে পরতে মালকোষ খুঁজতে চাইছিলাম তখন। আমার গ্রামের কাশ আর কোলকাতার কুমোরটুলি তখন সই পাতিয়েছে।

ওই হলুদের ছোয়াঁটুকু আজও কাটিয়ে উঠতে পারলাম না। ওই হলুদটুকুও যেন মালকোষের মত। মালকোষ শব্দটির অর্থ যিনি সাপকে মালা করে পরেন। অর্থাৎ শিব। পার্বতী হট টেম্পারড শিব স্যার কে ঠাণ্ডা করতে এই রাগ গেয়েছিলেন। পার্বতী ম্যাডাম টেকনিক্যালি ঋষভ আর পঞ্চম কে বাদ দিলেন। আর তার ঠিক পরের স্বরগুলো মানে গান্ধার আর ধৈবত হলো কোমল এবং আন্দোলিত। তাইতেই শুরু হলো ম্যাজিকটা বোধকরি। আমার কাছে ওই হলুদের মতই। কিম্বা ছাতিমের গন্ধের মত।

যদিও আমার তখনো চোখ ফোটেনি। আমিও ক্যামেরা হাতে দেখছিলাম আনকোরা চোখেই। দৃষ্টি তন্মাত্রের বাইরে বেরোয়নি।

তারপর আস্তে আস্তে চোখে পড়তে লাগলো আরেকটা কোলকাতা। যা গ্রামে বড়ো হওয়া একজনের কাছে বড় অশ্লীল মনে হল। প্রথম প্রথম মাত্রাটা কিছু সহনীয় ছিলো। যা দেখছিলাম, তা বৃহৎ হওয়ার অবশ্যম্ভাবী কুফল বলে মেনে নিচ্ছিলাম হয়তো। হয়তো ভাবছিলাম শহরটাকে ত চিনি না ভালো করে এখনো। এ শহর রত্নসম্ভবা। এর কাছে প্রচুর পাওয়ার আছে। অনেকটা মা-এর মত। তবু চোখ আটকে যাচ্ছিলো কিছু দৃশ্যে। যেগুলো ইঙ্গিত করছিলো কোথাও একটা গভীর ক্ষত আছে এই শহরের। একটা নীরব অভিযোগ আছে। হয়তো অভিমান। চিনতে পারছিলাম না।

বেশ বুঝতে পারছিলাম শহরটা ভালো নেই। প্রায় দশ বছর আগেকার কথা। এ শহর তখনো আমাকে আশা যোগায়। বাঁচিয়ে রাখে। এ শহর তখনো স্বপ্ন দেখতে শেখায়। এ শহরে প্রত্যেকদিন সন্ধ্যেবেলা একাধিক মঞ্চে নাট্যাভিনয় হয়। লোকে টিকিট কেটে দেখে। এবং কোন কোন নাটক হাউস্ফুল হয়। আমি নিজে ফিরে এসেছি। আমার কাছে এ শহর তখন গার্ডেন অব ইডেন। আমার গ্রামে বছরে সাকুল্যে দুমাস মোটে যাত্রা-নাটক হয়। রূপ, রস, গন্ধে, বর্ণে মাতোয়ারা কোলকাতার কাছে একজন শিল্পশিক্ষার্থীর আর কী চাওয়ার থাকতে পারে?

কিন্তু ধীরে ধীরে প্রশ্নমুখর চোখগুলো বড় তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো। আমি ভালো করে তাকাতে পারলাম না তাদের দিকে। ধীরে ধীরে বর্ণহীনতা গ্রাস করলো ছবিতে।

সপ্তাহখানেক আগে ট্যামরন-এর (একটি অত্যন্ত ভালো লেন্সপ্রস্তুকারক বণিকসঙ্ঘ) উদ্যোগে ধানবাদ আই আই টি তে একটি সেমিনারে গেছিলাম। ট্যামরনের বিহার অঞ্চলের প্রোডাক্ট স্পেশালিস্ট ছেলেটির নাম সিদ্ধান্ত্‌। তার শেখার আগ্রহ বেশ উপভোগ্য এবং যে কোন শিক্ষকের কাছেই বেশ লোভনীয়। সেমিনার সেরে আই আই টির চমৎকার গেস্টহাউসে গড়াচ্ছি। রাত্তিরে ফেরার ট্রেন। সিদ্ধান্ত্‌ ল্যাপটপ, পেন-নোটবই নিয়ে হাজির। তার কিছু প্রশ্ন আছে। আমিও বিড়ি ধরালাম। এক্সপোজার, লেন্স সংক্রান্ত কিছু হালকা কিছু প্রশ্নোত্তরের পর বললে, দাদা আপ সারে পিকচার ব্ল্যাক এণ্ড হোয়াইট কিঁউ করতে হো? এ প্রশ্ন আমি বারবার শুনেছি। আমার সমস্ত ছবিই সাদাকালো। আসলে সিদ্ধান্ত্‌-এর সমস্যা বেশ গভীর। সমস্ত সেমিনার বা ওয়ার্কশপ এরই একটি করে ক্রিয়েটিভ তৈরি হয়। সেমিনারের দিনক্ষণ এবং আরো কিছু জরুরী তথ্য দিয়ে সেগুলো আগে আগ্রহীদের কাছে পাঠানো হয়। এখন তাতে বক্তার কিছু কাজের নমুনা দেওয়ার একরকম চল আছে। তা আমার সব ছবি সাদাকালো হওয়াতে ক্রিয়েটিভ ডিজাইনার এর কাছে বাকি তথ্যাদির টেক্সট বা গ্রাফিক্স এ আমার ছবির সঙ্গে ম্যাচিং কালার প্যালেট এর অপশন কমে যায়। যুক্তিগ্রাহ্য সমস্যা। আমি কী আর বলি।

আমার কাছে বর্ণহীনতা কেমন যেন অমোঘ হয়ে উঠেছে আমার ছবির দৃশ্যদের কাছে।

কী তীক্ষ্ণ সে দৃষ্টিরা।

শহরটা সত্যিই ভালো নেই। প্রতিদিন দেখি।

তবু প্রতিবছর এই শরতের সময় কোলকাতা অপূর্ব রূপ নেয়। কোলকাতার রাস্তায় রাস্তায় সেই গন্ধ পাওয়া যায়। শোভাবাজার ঘাটে বসে শুনি এক কন্যে মধুর গলায় অতুলপ্রসাদী গান ধরেছে তার দয়িতের কাঁধে মাথা রেখে। সল্টলেকের রাস্তায় দেখি এক মজুরগৃহিনী ফুটপাথে বসে বাচ্চাটিকে দুধ খাওয়াচ্ছে। ওই ফুটপাথেই ওদের সংসার। পাশে দিগগজ বরটি উবু হয়ে বসে বিড়ি টানতে টানতে তাকে কতকিছু বোঝাচ্ছে। তার বাহুচালনার ধরণে মনে হল এ আসলে অভিমান ভাঙানোর কসরৎ চলছে।

এ সময় কোলকাতায় ছাতিম ফোটে। অসংখ্য ছাতিম গাছ আছে কোলকাতায়। ওরা সারাবছর অপেক্ষা করে থাকে এ সময়টাকে মাতাল করে দেবে বলে। মালকোষে ছাতিমের গন্ধ আছে। কোলকাতা সে উদযাপনে অকৃপণা। মালকোষ শান্ত করে। সংযম শেখায়। যেমন শেখায় দূর্গার রূপকল্পনা। শিল্পশিক্ষার্থীর চোখে সে রূপ গহীন অর্থবহ। দূর্গার দশ হাত দশেন্দ্রিয়, সিংহ কাম, অসুর ক্রোধ কল্পনার রূপায়ণ। লক্ষী ধন, গণেশ সিদ্ধি, সরস্বতী বিদ্যা অ্যান্ড মিস্টার কার্তিক কুমার বীর্য রূপকল্পনা। এই ফোর মাস্কেটিয়ার্সের বাহন গুলিও অসাধারণ শিল্পভাবনা বহন করে।

এ হল আমাদের শিল্পজ উত্তরাধিকার। এইমত আমাদের শিক্ষার ঐতিহ্য। দূর্গা ইন্দ্রিয়দমনের দেবী। ইন্দ্রিয়সংযমের রূপক।

এবার পুজোয় ক্রোধ বর্জন করুন। হিংসা বর্জন করুন সর্বতোভাবে। তবেই দূর্গাপুজোর অঞ্জলি দেওয়া হবে। উপোস না করলেও চলবে তখন।

আর আশেপাশে তাকান। কোলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ছাতিমের হলুদ গন্ধ অপেক্ষা করছে আপনার জন্য।

শুভ মহালয়া !

Admin Team

Saptarshi is a self-taught multi-discipline performer with major focus on fine art Photography. He brings his legacy of aesthetic experience from painting, music, literature and theatrics. He is working on Photography as visual art form for over a decade. He specializes both in technical and aesthetic aspects of Photography. Saptarshi worked as Human Resource Manager in a reputed multinational for 12 years before he stepped into Photography mentoring as full time profession in 2016. He has worked as HOD of Film & Photography division at Indian Institute of Digital Art and Animation. He also works as offcial mentor for Tamron, a leading lens manufacturer. He loves to explore new horizons and lifestyles which is a keynote to his photography works as well.