শুভ বিজয়া

লোকটা জুঁইফুল ভালোবাসতো

জীবনের গল্প এক জিনিস আর গল্পের মত জীবন আরেক। দুটোই সত্য বটে তবে স্বাদু ফারাক কিছু হয়তো থাকে। হয়তো বা থাকে না।

 

সদানন্দ ভাবলেন ব্যাপারটা প্রতক্ষ্য করে দেখবেন। মানে সদানন্দর গল্প লেখার সখ অনেকদিনের। সখ না বলে রোগ বলা বেহতর। বহু গল্প তিনি লেখার চেষ্টা করেছেন। সে অনেক চেষ্টাই অনেকে করে। দু একটা যে একেবারেই উৎরোয়নি তাও নয়। একটা দুটো ছোট পত্রিকায় প্রকাশিত। তবে সদানন্দের চাঁদ ধরার বাসনা। একটা বেশ সত্যি সত্যি নিজে পড়ে নিজেকেই বাহবা দেওয়ার মত গল্প লিখবেন। তারপর আর লিখবেন না। সমস্তই থামার কসরৎ।

 

সমস্যা হলো – বিস্তার। জীবন তো অগাধ, অবাধ। গল্প তো চলছেই। নিজের গল্প, বীজের গল্প। ত্যাড়াব্যাঁকা। দিনআনিদিনখাই রঙ।

প্রথমে সমস্যা হয় কি লিখবো। তারপর লেজ গজালে সেটা হয়ে দাঁড়ায় কিভাবে। শেষমেষ চোখ খুললে বাস্তবিকই সমস্যা টা হয় কতটুকু লিখবো। সদানন্দও ওই মোক্ষম মাপটুকুতে এসে আটকেছেন।

রোগশয্যায় শুয়ে প্রতি সকালে চামচে করে চা মুখে দিয়ে দিলে বড়মেসো বিরক্ত হয়ে বলতেন, তগো মাত্রাজ্ঞান নাই। তগো না অইব ভোগ, না অইবো ত্যাগ।

চায়ে চিনির মাত্রা কখনোই পছন্দ হতো না বড়মেসোর।

সদানন্দ ফিরে তাকালেন নিজের দিকেই। আদৌ ব্যাপারটা ভিসিয়াস সাইকেল হয়ে যাচ্ছে না তো।

 

দর্শন আর নির্মাণ দুটো প্রকৃতপক্ষে সম্পূর্ণ আলাদা মনে হলেও আদতে অভিন্ন। নির্মাণমাত্রেই ব্যক্তিক বিশেষ দর্শন। সেই দর্শন কে ভাগ করে নেওয়ার প্রবণতাই শিল্পসৃষ্টি বলে গৃহীত। সে নিজের সাথেই হোক বা অন্য পাঠক, দর্শক বা শ্রোতার সাথেই হোক। কিন্তু মূলস্তরে শিল্প এক বিশেষ দর্শনের অনুভব। হৃদয়ের গভীরতম প্রান্তে একটুকরো আলো। সেই সৃষ্টির ক্ষণ। প্রকাশ আসে পরবর্তী পর্যায়ে। কিছু মাত্রায় এ অনুভব নির্মাণের হাত ধরে ধরে চলে। তখন নির্মাণ নিজেই এক দর্শন হয়ে ওঠে সমস্ত অর্থেই। সেখান থেকে যাপন শুরু হয়।

এ এক পথ। এক সাধন।

অন্যতর পথে নির্মাণ নেই। বাকি অনুভবটুকু খাঁটি। সেই হঠাৎ ঝলকে ওঠা আলোখান আছে। সে আলোর তাপ আছে। ঔজ্জ্বল্য আছে। কিন্তু প্রকাশ নেই লেশমাত্র। এ পথের পথিকেরা প্রায়ই নিভৃতচারী।

আরেক অত্যল্প কিছু উদাহরণ আছেন, অনেকটা নির্বিকল্প থেকে ফিরে আসা মানুষজন। এনাদের কাছে প্রকাশ একটা খেলার মত। একটা দুর্দান্ত মজা। তীক্ষ্ণ, অন্তর্ভেদী মজা। অনুভবটুকু প্রকৃত আত্মস্থ করার পর এরা স্বাদু রসিকতা করেন।

 

আসলে সেই এক কে বহুভাবে দেখার ইচ্ছে। উন্নত স্তরে পাশ্চাত্য পণ্ডিতেরা একে বিনির্মাণ বলতে পারেন। যখন শিল্পভাবনা শিল্পের শরীর ছাড়িয়ে সুগন্ধের মত মিশে যায় বাতাসে।

অনুভবখানা ভাষায় বা অন্য যে কোন মাধ্যমে ধরতে গেলেই একটা আধার এসে যায়। তখন যেন প্রায় অবশ্যম্ভাবী ভাবেই অনুভবও সেই আধারের আকার নেয়। এ থেকে বেরোতে গেলে, সদানন্দ ভেবে দেখেছেন, একটাই পথ। সরাসরি গল্পখানা বলা। সপাটে বলে ফেলা কিছু সত্যি।

যেমন আজ  বিজয়াদশমী। বাঙালির বার্ষিক মিলনমেলা। কোলকাতায় এ সময় রাস্তায় রাস্তায় ফুল ফুটেছে। অথচ সদানন্দ ভাবছেন, এত আনন্দ কিসের? ভারি উন্নাসিক চিন্তা বটে। কিন্তু সদানন্দের আনন্দের কোন কারন সত্যিই নেই। অন্যান্য আরেকটা দিনের মতই খিদে, ঘুম এবং জীবনের আরো কিছু অপরিহার্যতা নিয়ে কেটে যাবে। যেমন কাটে দিন।

আমাদের সমস্ত রঙ, রস, বর্ণ, গন্ধ এক বৃত্তের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। সদানন্দ ভাবলেন। বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এলেই সমস্ত অর্থহীন। সমস্তই বেজায় বোরিং। গল্পের মূল সমস্যা হল গল্পটা থামে না কখনোই। থামতে জানে না। অনিবার্য সময়ের সঙ্গে ক্রমশঃ এগিয়েই চলে। একটা সময় বাহনকেই নিজে বহন করতে হয়। তবু মানুষ থামে না।

 

সদানন্দ ঠিক করলেন গল্পটা শেষ করা দরকার। রঙ ফিকে হয়ে আসছে ধীরে।

অনেক ভেবেচিন্তে তিনি দেখেছেন গল্পের শুরুটা আমাদের হাতে থাকে না। আমাদের অধিকার কেবলমাত্র শেষের অধ্যায়ে। একটা মহাকাব্যিক শেষ তার স্বপ্ন। ফ্যান্টাসি। এ যাবৎকাল তিনি যেটুকু হাঁটলেন তাতে দেখেছেন প্রতিটা দিন এক একটা নতুন অধ্যায়। প্রতিটা গড়ে ওঠা এক অনির্বচনীয় ভাঙন বপন করে নিঃশব্দে। প্রতিটা বিশ্বাসের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে মনসার ঘ্রাণ।

 

এই তো গল্প। এর বাইরে আর যা কিছু সমস্তই ধুলোখেলা। সই পাতিয়ে ভুলে যাওয়া অভিমান। না পাঠানো চিঠির হলুদ গন্ধ। আসন্ন শীতের রেখা ওঠা ঠোঁট।একটা সময় আসে। আসেই। পাতার হলুদও বিস্বাদ হয়ে পড়ে। সে পাতার গল্প শেষ হয় তখন।

গল্পটা হয়তো লেখা হল না সদানন্দের। কিন্তু শেষ টা তিনি নিজেই লিখবেন এ বিষয়ে তিনি অচঞ্চল।

কথা তো বেশি কিছু নেই। পৃথিবীর সমস্ত গল্পই আসলে এক পংক্তির। বাকিটা ওই। ধুলোখেলা।

 

সদানন্দ লিখলেন,

 

 

লোকটা জুঁইফুল ভালোবাসতো

শোভাবাজার ঘাট আর কুমোরটুলি ঘাটের মাঝখানে এক জায়গায় গঙ্গার ধারের পাঁচিলটা একটু ভাঙা আছে। সেখান দিয়ে নেমে গেলে একটা অশ্বত্থ গাছ। তার গোড়াটা বাঁধানো। সিমেন্ট বাঁধানো ঢালু পাড়। ঘাট নেই। তাই এখানটায় কেউ আসেনা তেমন। সারারাত ভাসানের পর এখন রাস্তাঘাট শুনশান প্রায়। অনেকদিন বাদে সদানন্দ বসলেন ওই অশ্বত্থের তলায়।

 

রাত তিনটের শব্দরা বোবা হয়। সদানন্দ ভাবলেন এভাবেই সত্যকে ছোঁওয়া যায় বুঝি।

 

এভাবেই গল্প হয় বোধহয়

 

সদানন্দ এগিয়ে গেলেন

শুভ বিজয়া

Admin Team

Saptarshi is a self-taught multi-discipline performer with major focus on fine art Photography. He brings his legacy of aesthetic experience from painting, music, literature and theatrics. He is working on Photography as visual art form for over a decade. He specializes both in technical and aesthetic aspects of Photography. Saptarshi worked as Human Resource Manager in a reputed multinational for 12 years before he stepped into Photography mentoring as full time profession in 2016. He has worked as HOD of Film & Photography division at Indian Institute of Digital Art and Animation. He also works as offcial mentor for Tamron, a leading lens manufacturer. He loves to explore new horizons and lifestyles which is a keynote to his photography works as well.