পুতুল খেলা

পুতুল খেলা

কপালের ওপর দুশ্চিন্তার স্বেদবিন্দুর মতো মরা বিকেলের রোদ এসে পড়েছে গ্লাসের কানায়। পর্দার একফালি ফাঁক দিয়ে একসার আসবাবপত্রকে আলগোছে টপকে এককোনায় টেবিলের ওপর অপাংক্তেয় গ্লাসখানাই জিতে গেলো শেষে। নিরঙ্কুশ ঘটনা কিছু নেই জীবনে। সমস্তই সমাপতন বুঝি। ফিরে যাওয়া ঢেউয়ের মতো আস্তে আস্তে আলো সরে যাচ্ছে ঘর থেকে।

শুক্তির মনে হলো শুধু এখনই বলা যায়। ঠিক এই মুহুর্তেই।

 

‘আমি অ্যবর্ট করতে চাই।’

সোপান শুনলো। স্থির। মার্জিত সহবত ওকে ফিরতি প্রশ্ন করতে শেখায়নি। কিন্তু ওর চোখে লেগে আছে ছাইয়ের মতো ধুসর হতাশা।

 

‘আমি অ্যবর্ট করতে চাই।’

পরিনত মানুষেরা নিজের অনুভুতি প্রকাশ করতে লজ্জা পায়। সোপান এখনও নিজের সমস্ত বোধ দিয়ে আঁতিপাঁতি করে মেনে নিতে চেষ্টা করছে, অথচ কিছুতেই মুখ ফুটে বলবে না – ‘করবে না!!’

 

কিছু কিছু মুহুর্ত বুকের থেকে প্রাণ শুষে নিতে পারে জোঁকের মতো। শুক্তি অভিমানী গ্লাসটাকে একটা হলুদ কটাক্ষ ছুঁড়ে দিয়ে বললো- ‘ধরে রাখতে পারলি না তো রোদ্দুরের ফোঁটাটাকে। পারবি কি করে? ওটা তো পুরোটাই মিথ্যে রোদ্দুর। শুধু শেষবেলায় তোকে চমকে দিতে আসে।’

 

সোপান কথা বলার একটা অবলম্বন খুঁজছে। একটা সিগারেট। কি একগ্লাস জল।

 

‘কিছু বললে না যে’

‘কি বলবো। তুমি তো ডিশিসান নিয়েই ফেলেছো।’

‘সোপান, তুমি বুঝতে পারছো না। বুঝতে চাইছো না।’

‘পারছি শুক্তি।’

‘না পারছো না। এভাবে হয় না। জন্ম থেকে ওকে একটা মিথ্যে উপহার দেওয়ার কোন’ অধিকার নেই আমার।’

 

ম্লান হাসলো সোপান। ইন্টেলেকচুয়াল চশমাটার জন্য ওর হাসিটা যে কি সুন্দর লাগে।

 

‘বসো। তোমার ফেভারিট ব্রু আছে। বানিয়ে দি… চেঞ্জ করবে? তোমার কাবার্ডের চাবিটা ডানদিকে ওপরের শেল্ফটায় আছে দেখো…’

বহু পরিচিত খাটটার এককোনায় অবাঞ্ছিতের মতো জড়োসড়ো হয়ে বসলো শুক্তি। কতদুর চেঞ্জ করে ফেলতে পারে মানুষ। শাড়ি, ব্লাউজ, অন্তর্বাস, বিছানার গন্ধ, ডাইনিং টেবিলের ওপর শুকিয়ে আসা ফুলের গোছটা… ঘর, মানুষ… একটা আকাঙ্খিত জীবন। তারপরও যদি ফিরতে হয় পুরনো কাবার্ডের সামনে।

চাবিগুলো পাল্টানো যায় না কখনোই।

 

ড্রেসিংটেবিলের সুদৃশ্য আয়নাটার দিকে তাকালো শুক্তি। স্থির হয়ে থাকলো কিছুক্ষন। আয়নাটা ঝাপসা হয়েছে। ধুলো পড়েছে কিছু। মোছা হয়নি। শুক্তির আয়নার খুব শখ। ঝুলোঝুলি করে বারণ করা সত্বেও বাবা এই ড্রেসিংটেবিলটা দিয়েছিলেন। আনমনে উঠে এল আয়নার সামনে। তার স্তুপীকৃত চিহ্নের কিছুমাত্র পড়ে নেই।

 

সোপান ঢুকছে কফি নিয়ে।

‘আমার চিরুনিটা-‘

‘সব আছে। বাঁদিকের ড্রয়ারটা খোলো -‘

 

নিজের জন্য ব্ল্যাক কফি এনেছে সোপান। দু’টোর পরে তৃতীয় সুগার কিউবের দিকে হাত বাড়াতেই শুক্তি বললো – ‘মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার অভ্যেসটা এখনো ত্যাগ করতে পারলে না।’

‘হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। তোমার উইটের মাত্রাজ্ঞানটা কিন্তু দারুন।’ একটু থেমে স্মিতমুখে জিজ্ঞেস করলো –

‘আনন্দ কেমন আছে ?’

‘ভালো। বাঁকুড়া গেছে সম্বর্ধনা খেতে।’

‘ওর রিসেন্ট বইটা পড়লাম। ওকে বোলো ওর এবার নাগরিক সমাজের মিছিলে হাঁটার সময় এসে গেছে।’

 

সুক্ষ্ম বিদ্রুপটাকে টোকা দিয়ে ফেলে দিলো শুক্তি।

 

‘ও মানুষ সোপান। তোমার মতো মহাপুরুষ নয় যে সমস্ত কথার মধ্যেই অলৌকিক সত্য উগলে আসবে।’

‘আসলে আকাঙ্খার নাগাল পেলে চোখ বুজে আসে। যুদ্ধ জয় করে ওর তো এখন রসগ্রহন করার পালা।’ চিরুনিটাকে ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখে বললো – ‘আমি ভাবছি এবার কবিতা লিখবো।’

‘প্লিজ সোপান, প্রিমিটিভ ভান কোরো না তো। তোমার সঙ্গে ওর কোনো যুদ্ধ নেই।’

‘তা নেই। দিব্যি জমি ভাগ করে নিয়েছি। আমার সমাজ, ওর সংসার। তবে ওকে বোলো একটা মোটা অঙ্কের চেক পাঠাতে। এই মাগ্গিগন্ডার বাজারে পিতৃপরিচয়ের মতো মহার্ঘ জিনিস বিনামুল্যে বিতরন করা যায় না। কি বলো ?’

 

‘সোপান, আমি অ্যাবর্ট করতে চাই।’

 

‘আনন্দ?’

‘জানে না।’

‘শুক্তি, আমায় খুব পরিস্কার করে বলবে তুমি ঠিক কী চাও?’

একটা উথলে ওঠা নীরবতার পরে শুক্তি বললো –

‘আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে একবার আমার সত্যি মুখটাকে দেখতে চাই।’

‘ছেলেমানুষি কোরো না। আনন্দর সঙ্গে কথা বলো।’

‘তোমার কি মনে হয় ও অন্য কথা বলবে?’

‘কিন্তু ওর জানা দরকার।’

‘কী লাভ?’

‘আশ্চর্য, ওর-‘

‘তুমি আমার থেকে ওকে বেশি চেনো না সোপান। লেখার বাইরে ওর কোনো দায়বদ্ধতা নেই। ওর সঙ্গে মাটির যোগ কেবল শিকড়ে রস নেওয়ার জন্য।’

‘অর্থাত্ প্রয়োজন।’

‘বলতে পারো। ভালোবাসাও তো প্রয়োজনই সোপান।’

 

ছায়াহীন আলো পড়ে গ্লাসটার কারুকাজ করা গায়ে নানারকম রং খেলেছে। শুক্তি, সোপান দাঁড়িয়ে আছে স্থির। সময়ের সাথে লুকোচুরি খেলছে প্রানপনে। দুজনের মাঝখানে একটা অলঙ্ঘ্য পরিচিত খাট।

 

‘এবার বোধহয় আমাদের একটা সিদ্ধান্তে আসা প্রয়োজন।’

শুক্তি তাকালো সোপানের দিকে। বুঝে নিতে চাইছে কতটা গভীরে লুকিয়ে আছে কথার শিকড়।

‘কী বলতে চাও?’

‘সেটা তুমি বুঝতে পারছো শুক্তি। দ্যাখো…’

 

আয়নার পাশের বন্ধ ড্রয়ারটার দিকে তাকলো শুক্তি। ওর সমস্ত প্রসাধন লুকিয়ে রাখা ওর ভিতরে। ওগুলো বাইরে রাখা যায় না? কি সব বলে চলেছে সোপান। ওর কানে ঢুকছে না। ও শুনতে চায় না। সম্পর্ক, সন্তান, সমাজ, সংসার – সমস্তই বেঁচে থাকার অনিবার্য ভান। সোনার দোকানে সাজিয়ে রাখা গয়নার মতো মিথ্যে।

 

‘উত্তর দাও শুক্তি-‘

‘হুঁ-‘

‘কী করবে?’

‘এতবড় একটা মিথ্যে -‘

‘শুক্তি, মিথ্যেটাই তো সুন্দর। সত্যির মধ্যে কোন সৌন্দর্য নেই, আছে শুধু আলো। সমস্ত জীবন জুড়ে তো আমরা মিথ্যেটাই ভালোবাসি। We lie to love, we love to lie. ‘

সোপানের হাতদুটো শুক্তির কাঁধে বিশ্রাম নিচ্ছে। শুক্তি মুখ তুলো তাকালো। চশমার ফাঁক দিয়ে কি নরম হয়ে এসেছে সোপানের চোখ।

 

‘আর আনন্দ…?’

Admin Team

Saptarshi is a self-taught multi-discipline performer with major focus on fine art Photography. He brings his legacy of aesthetic experience from painting, music, literature and theatrics. He is working on Photography as visual art form for over a decade. He specializes both in technical and aesthetic aspects of Photography. Saptarshi worked as Human Resource Manager in a reputed multinational for 12 years before he stepped into Photography mentoring as full time profession in 2016. He has worked as HOD of Film & Photography division at Indian Institute of Digital Art and Animation. He also works as offcial mentor for Tamron, a leading lens manufacturer. He loves to explore new horizons and lifestyles which is a keynote to his photography works as well.