নিখিলেশ এবং

নিখিলেশ এবং

 

তখন নিখিলেশ ভাবলেন এবার পাখি পুষবেন। অনেক কথা হল। কাজও হল অনেক। বাগানের সমস্ত গাছ বাঁচিয়ে রাখা যায় না যখন তখন ফলের কথা ভেবে লাভ কি। তখন নিখিলেশ ভাবলেন এবার পাখি পোষা যাক।

একটা ডিমের মত গোল লোক তাকে একবার একটা আপেলের চারা দিয়েছিল। বাগানে লাগানোর জন্য। তা সেই আপেল চারার ইস্তেহার শুনে পাড়ার উকিল বললেন সমতলে আপেল গাছ হতে পারে, আপেল কিন্তু পাহাড়েই হবে। কথাটা নিখিলেশের মাথায় ঢোকেনি। রান্নাঘরের পাশে আপেল গাছ লাগালে ফল হবে উত্তর পাহাড়ে? এ কেম্নি আবদার। কিন্তু এ পাড়ায় একমাত্র উকিলের কথাই বিশ্বাসযোগ্য। তারপর ভাবলেন ফল যে হবে না তা তো বলেননি উকিল। সে পাহাড়েই হোক না কেন। রান্নাঘরের নালার জলও তো গিয়ে কর্পোরেশানের বড় নালায় পড়ে। তা বলে কি রান্নাঘরে নালা থাকবে না। তা নিখিলেশ আপেল গাছটা লাগিয়েই ফেললেন রান্নাঘরের পাশেই।

তারপর সে একটা কাজ হল আপেল গাছে জল দেওয়া রোজ। জল দেন আর ভাবেন ঠিক কোন পাহাড়ে ফলবে আপেলখানা! জল দেন আর ভাবেন সমতলের যে আপেল পাহাড়ে ফলে তাদের পাতার রঙ কি একরকম সবুজ? সে গাছে জল দেয় কে? কেন দেয়? হাজারো প্রশ্ন মনে জাগে। মাঝে মাঝে এক ফাঁকে ভেবে নেন নিউটনের কথা। নিউটনের আপেলের গাছ ছিলো কোথায়? সে গাছের পিতা প্রপিতামহকে নিউটন চিনতেন নিশ্চয়। তারা জানতেন নিউটনের নাম? স্বর্গের বাগানের আপেলের গাছ কি আসলে মর্তে লাগানো ছিল তাহলে? চুপিচুপি ঈশ্বর আগেই মর্ত সৃষ্টি করে রাখেন নি তো?

আপিসে লেট হয়ে যায় আপেলের গাছের সাথে খুনসুটি করতে করতে। বসকে একদিন জবাবদিহির চোটে বলেই ফেললেন আপেলের রোজনামচা। গাছের রোজনামচা আসলে। বস প্রথমে গম্ভীর হলেন। তারপর ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন মিনিটখানেক। তারপর ঠোঁটের ফাঁকে একচিলতে হাসি মাখিয়ে বললেন যাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে তারা আপেল গাছ লাগালে জাহান্নমেও আপেল ফলে না।

এইবার নিখিলেশ পড়লেন মহা ফাঁপরে। জাহান্নম সম্পর্কে নিখিলেশের তেমন একটা আইডিয়া নেই। উকিলেরও আছে কিনা সে বিষয়ে কেমন সন্দেহ হল তার। অথচ উকিল ছাড়া জিজ্ঞেসই বা করেন কাকে? বসের কথা একেবারে ফেলনা বলে ফেলেও দেওয়া যায় না। যাচাই করা দরকার অন্ততঃ। আপিস থেকে ফিরে এক প্যাকেট গোল্ডফ্লেক নিয়ে উকিলের কাছে গেলেন আবার। প্যাকেট দেখে উকিল হাসিমুখে বললেন চা খাবেন তো নিখিলেশ? তার উশখুস দেখে উকিল বুঝেছেন আপেলে সমস্যা হয়েচে। সেই হল কাল। একথা সেকথায় ঘড়ির কাঁটা দুচরকি পাক খেয়ে গেল, উকিল আর আপেল নিয়ে রা কাড়েন না। নিখিলেশ যখনই গাছের কথা টানেন তো উকিল টানেন দর্শন। নিখিল আপেল টানেন তো উকিল বিজ্ঞান। নিখিলেশ জাহান্নম টানেন তো উকিল টানেন মান্টো কি ঘালিব। নিখিলেশ এসব কিছুই বোঝেন না। তিনি শুধু জানতে চান আপেলটি ফলবে কিনা আদৌ। পাহাড়েই হোক কি জাহান্নমে। নাহলে তো জল দেওয়াই সার। যতক্ষন গোল্ডফ্লেক ছিলো টানা চা খাইয়ে গেলেন উকিল, কিন্তু আপেলবৃত্তান্তের ধার মাড়ালেন না। ঘালিব যতটা জানেন উকিল জাহান্নম ততটা নয় বোধহয়। ফিরে এলেন নিখিলেশ।

সকালে অভ্যাসমত গাছে জল দিতে গিয়ে দেখেন মুনিয়ার মার ধেড়ে পাঁঠা আরাম করে আপেল পাতা খাচ্চে। মানে খাচ্চে না, প্রায় শেষ করে ফেলেছে। এতটাই খেয়েচে যে এখন আর বারন করার কোন মানে হয় না। মনে মনে ডিমের মত লোকটাকে আচ্ছা করে গাল দিলেন নিখিলেশ। আপেল গাছে বেড়া দিতে হয় সে বিষয়ে একটা কথাও বলেনি লোকটা। গোল্ডফ্লেকের প্যাকেটটার জন্য কষ্ট হলে নিখিলেশের। উকিলেরা কিচ্ছু জানে না। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের কথাটা তাকে আগেই সাবধান করে দেওয়া উচিত ছিলো উকিলের।
সেদিন এক্কেবারে কাঁটায় কাঁটায় আপিস পৌঁছলেন নিখিলেশ। ঢোকার আগে বসের জন্য এক প্যাকেট গোল্ডফ্লেক কিনলেন। তারপর ভাবলেন এবার পাখি পুষবেন।


 

আজ নিখিলেশ হঠাৎ পড়ে গেলেন রাস্তায়। নাহ, মাথাটাথা ঘোরেনি। হোঁচট খেলেন কি? তাও ঠিক মনে করতে পারছেন না। চশমাখানা ছিটকে গিয়ে পড়লো চারহাত দূরে। সঙ্গে সঙ্গে চৌচির। আশপাশ থেকে লোকজন ছুটে এল। নিখিলেশ রাস্তায় বসে বসেই ভাবলেন – আহা, বেশ মজা তো। হাত ধরে তুলে তারা তাকে এক চায়ের দোকানে নিয়ে বসালে। একজন জল এগিয়ে দিতে মুখেচোখে জল দিলেন একটু। তারপর বললেন – আমার চশমাটা? একজন কুড়িয়ে এনেছে ফ্রেমটা। কাঁচ অবশিষ্ট নেই কিছু। চায়ের দোকানি ততক্ষনে একগেলাস দুধ এগিয়ে দিয়েছে – খেয়ে নিন জ্যেঠু, চাংগা লাগবে। সাদা গেলাসটার দিকে তাকিয়ে নিখিলেশ ভাবছেন জুলপিতে কলপ করতে হবে এবার। বললেন, ভাঁড়ে একটা চা হবে দাদা? চিনি কম হলে ভাল হয়।

চশমা না থাকলে এমনিতে কোন অসুবিধে নেই। কেবল কাগজটা পড়া যায় না। কাগজ পড়ার ভারি সখ নিখিলেশের। একই খবর দু তিনটে কাগজে পড়েন। চারপাশ সম্বন্ধে যে খুব একটা খবর রাখতে চান তা নয় কিন্তু। পড়তে ভালো লাগে। খুন জখম, ধর্ষণ, চুরি জোচ্চুরি এসবের মধ্যে বেশ একটা রগরগে জীবন উপভোগ করেন। বিনোদন হিসেবে পড়েন। এখন সমস্যা হল চশমাটা নিয়ে।

আসলে সমস্যাটা আরো গভীরে। নিখিলেশের চশমা হল গিয়ে একটা অভ্যেস। যতটা দেখার কাজে লাগে তার চ্যে ভরসা যোগানোর কাজে লাগে বেশি। অনেকটা তাকভর্তি বইয়ের মত। কিংবা বিছানায় মাথার গোড়ায় নিয়ে শোয়া টর্চটার মত। আজ কুড়ি বছর নিখিলেশ জীবন দেখেছেন চশমার ভিতর দিয়ে। চশমার ফাঁক দিয়েও কিছু কিছু দেখেছেন বটে। ভারি মজার দেখা সে সব। কিন্তু সে তো চশমা ছিলো বলেই না। এখন পুরো পৃথিবীটা সাদা চোখে দেখতে হলে তো ভারি মুশকিল। নাহ, কি করে যে পড়ে গেলেন নিখিলেশ!

বাসায় ফেরার মুখে উকিলের সঙ্গে দেখা। বিমর্ষ দেখে উকিল জিজ্ঞেস করলেন – কি নিখিলেশ, মনকেমন?
নিখিলেশ বললেন – আর বলেন কেন, রাস্তায় হঠাৎ পড়ে গেলাম আজ। গিয়ে চশমাটা……
– সে কি! কোথাও লাগে টাগে নি তো? চশমা সে আর একখান বানিয়ে নিলেই হবে। পাওয়ারটাও একবার চেক করিয়ে নেবেন।

স্মিত হাসলেন নিখিলেশ। বললেই কি আর একটা চশমা বানানো যায়! আবার চল্লিশটা বছর হেঁটে আসতে হবে না তাহলে? তবে চশমা থাকলেই যে পাওয়ার পাল্টে পাল্টে যায় এটা তো খেয়াল ছিলো না তার।
তবে কি চশমাটার জন্যই আজ পড়ে গেলেন নিখিলেশ?


 

নিখিলেশ একজন চুড়ান্ত অসফল মানুষ। মানুষ না বলে একজন চুড়ান্ত অসফল জীব বলা ভালো। ন্যুনতম যতটা সফলতা চিহ্ন পেরোলে মানুষ হয়ে উঠেছেন বলা যায়, তাও তিনি পেরিয়ে উঠতে পারেন নি। দেরিদা বা ফুকো পড়া হয়ে উঠেনি নিখিলেশের। মেটামরফোসিসের গল্প শোনেননি। ব্রেষট-এর এলিয়েনেশেন সম্বন্ধে ধারণা নেই নিখিলেশের। পোস্টকলোনিয়ালিজম শব্দটা শোনেননি জীবনে। পড়াশোনার ঘরে গোল পড়লো নিখিলেশের।

তা পড়েননি ভালো কথা। সবকিছু কি পড়ে ওঠা যায়! করেছেনই বা কিছু কি সারধর্ম? বহুদিন আগে বাড়ির জানলার গ্রিলে রঙ করতে গিয়েছিলেন একবার। দুপয়সা বাঁচানোর ধান্দায়। সেদিন তুলি টানতে টানতে বুঝেছিলেন শিল্পী আর কর্মীর তফাৎ কোথায়। তা সেই বোঝার ঠেলায় নিখিলেশ গেলেন শিল্পী হতে। ব্যাস। নিখিলেশ মরতে বসলেন আয়োজন করে।

সারি সারি শিল্পী দাঁড়িয়ে বিশ্বজুড়ে। নিখিলেশ কোথায় দাঁড়ান! কাকে বলেন মনের কথাটি। কেমনে বলেন। সবচ্যে বড় সমস্যা হলো বলার কথাটি নিয়ে। প্রথমে ভেবেছিলেন এ বুঝি নিজের কথা নিজের সুরে বলা। তারপর দেখলেন ব্যাপারটা তা নয়। আসলে সবার মিলিয়ে একটা বড় কথা আছে। নিজের ছোট ছোট কথাগুলো সেই বড় কথার সুরে না মিললেই চিত্তির। একটা স্রোত আছে। প্রথমে সেইখানে ভাসতে শিখতে হবে। বুঝে নিতে হবে সমকালে শিল্পের চালু ভাষাখানা। তা এইসব কান্ড হবে কি করে? পড়তে হবে। দেখতে হবে ঠিক কী হল আর কী এখনো হল না। মোটকথা জানতে হবে এক সমুদ্র। সেইটেই মাপকাঠি। মাথা ভার হয়ে তবে চোখের জলে ভিজে উঠবে বুক। এই বুঝি নিয়ম।

নিখিলেশ ভেবেছিলেন বুঝি অনুভবখানা খাঁটি হলেই শিল্পসৃষ্টি সম্ভব। এখন দেখলেন তা নয়। অনুভবখানা তেমন খাঁটি না হলেও চলে। কেবলমাত্র প্রকরণজ্ঞান দিয়ে দিব্যু ম্যানেজ করা যায়। আর কাজ তো সব কথা বলে না। কাজের সাথে সাথে আলাদা করে পকোড়ার সঙ্গে স্যসের মত থাকে ইতিহাস। শক্তির সাথে যেমন মাতলামি। জীবনানন্দের সাথে ট্রাম। এখন নিখিলেশ কবিতা লিখতে বসেছেন আর বিষ্ণু দে’র কবিতা সম্পর্কে তার কোন মতামত থাকবে না এ তো হতে পারে না। শিল্পী মাত্রই জন্মগত ক্রিটিক! কিন্তু নিখিলেশের কাছে তো তথ্যভাণ্ডার নেই। সংগ্রহে তার চিরকালের অনীহা। নিখিলেশ কবিতা নিয়ে পড়াতে গেলেন উকিলের কাছে। উকিল বললেন, নেরুদা পড়েচেন নিখিলেশ? আহা! বুকাওস্কি? ওফ!! ওই হচ্চে লেখা। গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।
নিখিলেশ কবিতা পড়াতে গেলেন রান্নার মাসি কে। সরলামাসি বললেন, দশ তারিক হয়ে গেল। মাইনেটা দিবা না?

এতকিছুর মধ্যেও দুখানা পাঠক ঠিক পেয়ে গেলেন নিখিলেশ। চায়ের দোকানের ভুলো আর অফিসের বাইরে মোটা কৃষ্ণচূড়া গাছখানা। নিখিলেশের মত এদেরও কোন মতামত নেই। এরা দুজনেই নিখিলেশ বাদে আর কারো লেখা পড়েনি। বস মনে হয় আন্দাজ করেছিলেন কৃষ্ণচূড়া গাছের কথাটা। বসেরা যে কি করে খবর পায় এইসব! বললেন – নিখিলেশ, শেয়ালকে রাজা হওয়ার জন্য বাঁশবাগান খুঁজতে হয়। আপনি তো এক্কেবারে এলিট গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়ালেন। বলে হাসতে লাগলেন ফ্যাক ফ্যাক করে। বসকে হাসতে দেখলেই একখান বিশাল বোলতার কথা মনে পড়ে নিখিলেশের। ছোটবেলায় একবার কামড়েছিল। তিনদিন জ্বরে ভুগেছিলেন নিখিলেশ।

নিখিলেশ তো ডিকনস্ট্রাকশান জানেন না। তাই নিখিলেশ একই রাস্তায় হাঁটেন রোজ। ভাবেন রাস্তা বুঝি শেষ হবে। বসকেও একদিন কবিতা পড়ে শোনানো যাবে বুঝি। রান্নার মাসি পাওনা গণ্ডা ভুলে কবিতা শুনতে শুনতে ভাত পুড়িয়ে ফেলবে। উকিল বলবেন গুলি মারুন নেরুদাকে। আপনি কী লিখেছেন শুনি।

উকিল মাথার ভিতর ফিসফিস করে ওঠেন, ওসব ফালতু ভাববেন না নিখিলেশ। খৈয়াম অন্ততঃ পড়ুন একবার। দিগন্ত খুলে যাবে মশাই।

লাঞ্চ ব্রেকে নিখিলেশ ভুলোকে বিস্কুট খাওয়াতে খাওয়াতে বলেন – শোন, আমি খৈয়াম বুঝি নে, উত্তম-অধম বুঝি নে। কবিতাও বুঝি নে, শিল্পও না। আমি যা লিখি সেই আমার। কৃষ্ণচূড়ার ভালো লাগলে আর নেরুদার লাগলো কিনা কি আসে যায় বল।

তারপর সমস্ত অক্ষম প্রচেষ্টা যেভাবে শেষ হয়। ধীরে ধীরে লোকে বুঝে গেল এই লোকটি একটি ফাঁপা বেলুন মাত্র। নিখিলেশও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। ব্যার্থতার মত বড় মুক্তি আর দুটি নেই।
অফিস প্রায় শেষ হয়ে এল।
এবার বাড়ি ফিরবেন নিখিলেশ। সরলামাসির মাইনেটা দিয়ে দিতে হবে আজ। উকিলের জন্য দুটো গোল্ডফ্লেক বেশি কিনলেন।

বিশ্বশুদ্ধ সহস্রকোটি কবিদের আটকে রাখতে গোল্ডফ্লেকের জবাব নেই।


 

খাঁচার পাখিকে তার ওড়ার অক্ষমতা নিয়ে বিদ্রুপ করা সোজা। কিন্তু তার ওড়ার ইচ্ছেটা যে ষোলোআনা থেকেই যায় সে খবর রাখে কজন। নিখিলেশ ভেবেছিলেন তিনি বড় হয়ে নিখিলেশ হবেন। ভাবনাটা যেই ডানা পেল সেই থেকে তিনি বড় হচ্ছেন। প্রতিদিন একটু একটু করে। ক্রমাগতঃ বড় হচ্ছেন। গত পঁচিশ বছরে নিখিলেশ শুধু বড় হয়েছেন। ক্রমাগতঃ। মুশকিল হল তিনি যত বড় হন, বেড়িও তত বাড়ে। যতবার গন্তব্য পেরিয়ে যান, ততবার নতুন ল্যাপ শুরু হয়ে যায়। কোন ল্যাপে যে দৌড় শেষ হবে সে খবরটা কেউ দিতে পারলে না। অগত্যা নিখিলেশ বড় হতে থাকেন আপনমনে। ভেবে দেখলে ব্যাপারটা সমীচীন নয় যদিও, কিন্তু যে খেলার যে নিয়ম। ছোটবেলায় দাবা খেলতেন বাবার সাথে। হেরে যাওয়ার উপক্রম দেখলেই বোর্ড উলটে পালাতেন। কিন্তু এখন তিনি নিয়ম করে অনেকটা বড় হয়ে গেছেন। বোর্ড উলটে দেওয়াটা এখন বালখিল্যতা হয়ে যাবে যে।

শেষমেশ নিখিলেশ যখন বুঝেই গেলেন যে আসলে ওড়া নয়, ওড়ার ইচ্ছেটুকুই জীবন। খাঁচাটা বাঁচার ফিকির। তখন তিনি ভাবলেন খাঁচাটাকেই সাজানো যাক তাহলে।
নতুন কিছু ভাবলেই উকিলের সঙ্গে একবার কথা বলতে লাগে। শনিবার সকাল সকাল খাতা পেন্সিল নিয়ে গেলেন উকিলের বাড়ি। খাঁচা কি দিয়ে সাজায় জানা তো নেই। কিছু কেনাকাটি করতে হলে লিস্ট করে নিতে হবে। মুখে যাই বলুন, এলেম আছে ভদ্রলোকের। খাতা পেন্সিল দেখেই জিজ্ঞেস করলেন, কি নিখিলেশ, আজ কি অঙ্ক প্র্যাকটিশ হবে?
খাঁচার পেছনে এতটা গুরুত্ব ব্যয় করা কাঁচা কাজ হয়ে যাবে কিনা সে নিয়ে তো সন্দেহ ছিলোই। কাজটা ঠিক হচ্ছে কিনা উকিলকে জিজ্ঞেস করতেই লাফিয়ে উঠলেন উকিল, আলবাৎ ঠিক। ট্রেন বলে কি টয়লেট পরিস্কার থাকবে না। ব্যাস আর কোন চিন্তা নেই। গোল্ডফ্লেক শেষ হতেই উকিলের বানিয়ে দেওয়া লিস্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন নিখিলেশ।

লিস্টে অবশ্য বিশেষ কিছু নেই তেমন। গোটাকতক রঙিন শার্সি আর কয়েকখান জমিদারি আয়না। সোজা হিসেব। সব জানলায় থাকবে রঙিন শার্সি। আর সব দরজায় থাকবে আগাপাছতলা আয়না। উকিল বলেছেন এরচ্যে ভালো সাজানো আর হতেই পারে না। একটু কিন্তু কিন্তু প্রশ্ন ছিলো নিখিলেশের। দরজার জায়গায় আয়না লাগালে যে আসবে তাকে দেখা যাবে নাকি নিজেকেই দেখা যাবে সে বিষয়টা পরিস্কার হচ্ছে না। তা উকিল বললেন, ওই একই হল। ভারি গোলমেলে কথা বলেন উকিল মাঝে মাঝে।

উকিলের কথামত সবই সাজানো হল বটে। তবে ছোট্ট একটু গোলমাল হয়ে গেল। উপযুক্ত পরিমান শার্সি পাওয়া গেল না বাজারে। দোকানি বললে, একটা জানলায় নাহয় আয়না লাগিয়ে দেই। নিখিলেশও ভাবলেন এমন কি আর তফাৎ হবে। কিন্ত সেই কাল হল। নিখিলেশ এখন সেই আয়না লাগানো জানলার পাশ থেকে আর নড়তে পারছেন না। সেখানেই বসে থাকেন বাড়ি ফিরে। ওই জানলা দিয়েই তার আকাশ দেখার শখ হয়েছে ইদানিং। কেন জানি মনে হচ্ছে নিখিলেশ আরো কিছু বড় হলে আয়না এসপার ওসপার হয়ে যাবে। এইটা আদৌ হয় কিনা সে কথাটা কেউ বলতে পারছে না ঠিক করে। উকিল খালি মিচকে হাসেন। বলেন, শার্সি তো কম পড়বেই। আপনার জানলা নেহাত কম ছিলো নাকি।

ভারি ভুল হয়ে গেল। ভারি ভুল হয়ে গেল। নিখিলেশের বড় হওয়ার নেশা আর ঘুচলো না।


 

খাওয়ার উদ্দেশ্য দুরকম। রসনাতৃপ্তি আর স্বাস্থ্যসঞ্চয়। কোনটাই কম জরুরি নয়। কিন্তু মজাটা হল রসনাতৃপ্তিতে মন দিলে স্বাস্থ্যসঞ্চয় ঘটে না প্রায়শঃই। আবার স্বাস্থ্যসঞ্চয় করতে গেলে রসনার গোঁসা হওয়ার প্রভূত সংশয়। তাহলে বেচারা যান কোন দিকে।

হয়েছে কি, কদিন ধরে একটা দাঁত বেজায় ভোগাচ্ছে নিখিলেশকে। চোয়াল নড়াচড়া প্রায় বন্ধ। ওষুধ খেলে খানিক কমে, একটু পরেই আবার যে কে সেই। ফলতঃ মেনু একলাফে সাত্ত্বিক ভাব টপকে স্থিতপ্রজ্ঞ অবস্থায় গিয়ে ঠেকেছে। এমনিতে নিখিলেশ যে জিভের ওপরেই বেঁচে থাকেন তেমন নয়। তবে বর্ষার ইলিশটা কি রোববারের সকালে আলুর সাদা তরকারির সাথে লুচির হাতছানি পরকীয়া প্রেমের মতই এড়াতে পারেন না। বেঁচে থাকতে গেলে পরিমিত উপভোগ জরুরি বৈকি। তা নাহলে রসনায় স্বাদ আর যৌনমিলনে তুরীয় আনন্দের স্কোপ রাখাই কেন হয়েছে।

এ তত্ত্বজ্ঞান নিখিলেশের ছিলো না তা নয়। তবে উপলব্ধিটা এলো দাঁতের ব্যথায় গাল ফুলে ঢোল হওয়ার পর।

আপিস ফেরতা উকিলকে হাঁক মেরে আসা রোজকার অভ্যেস। আজ নিয়ে দুদিন দাঁতের ঠেলায় যাওয়া হয়নি। বিকেলে উাকিল খোঁজ নিতে এসে হাসতে হাসতে বললেন, এ ভালোই হয়েছে আপনার। নির্জলা সত্যি মাথা থেকে বুকে নামতে একটা অন্তরটিপুনি ব্যথা লাগে মশাই। তা ছাড়া অন্য রাস্তা নেই। নিটের মজাটাই তো ওই। যন্ত্রণার চ্যে বড় নেশা আর আছে নাকি!

গোটা চারেক গোল্ডফ্লেক ধ্বংস করে উকিল উঠলেন।নিখিলেশ ভাবলেন, তার মানে কি ওষুধ না খেয়ে দাঁতের ব্যথাটাকে চাগিয়ে রাখবো নাকি। ব্রহ্মরন্ধ্র জ্বলে যাচ্ছে ব্যথার ঠেলায়, আর ওনার নেশা ঠেকছে। যত্তসব!

ব্যথাটা কিন্তু কমলো না। মানে ওই কমে কিন্তু আবার ফিরে আসে। নিখিলেশ খেয়াল করে দেখেছেন ঠিক যে কমে যায় তাও নয়। ব্যথা থাকে নিজের মতই। আনকাজে মন থাকলে তিনিই ভুলে যান দাঁতের কথা। আবার ফস করে মনে পড়লেই ব্যথা করে। এলাকার বড় ডাক্তার দেখিয়েছেন নিখিলেশ। তিনিও বললেন, দাঁতের ব্যথা শুরু হলে একবার আর জীবনে আর মুক্তি নেই। তুলে ফেললেও যে শান্তি পাবেন তা নয়। একটা যাবে আর একটায় শুরু হবে। নিখিলেশ বললেন, তা বত্রিশ পাটি তুলে সাফ করে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। ডাক্তার গব্বর সিং-এর হাসির মিমিক্রি শুনিয়ে বললেন, তা যায় বটে। তবে কিনা ব্যথা নাকি দাঁতে হয়ই না। হয় দাঁতের গোড়ায়। এখন গাছ কেটে মাটি ভালো করা ভগবানের অসাধ্য।

তারপর সে একটা ভারি গোলমেলে চক্কর শুরু হল। দাঁতের ব্যথার কথা ভুলে গেলে নিখিলেশ আইসক্রীম খান, আইসক্রীম খেলে দাঁতে ব্যথা হয়, দাঁতে ব্যথা হলে নিখিলেশ থম মেরে বসে থাকেন, বসে থাকলে নিখিলেশ কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, কাজে ব্যস্ত হলেই দাঁতের ব্যথার কথা ভুলে যান। এবং আইসক্রীম খেতে ইচ্ছে করে! এরকম চলতে চলতে আইসক্রীম খেতে ইচ্ছে হলেও দাঁতের ব্যথার কথা মনে পড়তে লাগলো। কিন্তু ততদিনে নিখিলেশ ব্যথাটাকে কেমন যেন ভালোই বেসে ফেলেছেন। এখন আইসক্রীম খাওয়ার পর কোনদিন বাইচান্স ব্যথা না হলে কেমন মনখারাপ হয়। চিমটি কেটে দেখতে ইচ্ছে করে বেঁচে আছেন কিনা।

সেদিন পাড়ার দোকানে একটা নতুন আইসক্রীম ট্রাই করার সময় উকিল দেখে ফেললেন। দেখে নিখিলেশের পিঠে একখান বিরাশি সিক্কার প্যাট করে বললেন, এই তো পথে এসেছেন। আপনার চিন্তা কিসের মশাই। যারাই আইসক্রীম খায়, সক্কলের দাঁতের গোলমাল বুঝলেন। পালাবেন কোথায়। বিন্দাস খেয়ে যান। তারপর দোকানিকে বললেন, আমাকেও একটা দে দেখি।

খুব ঠান্ডা দিসনে যেন।


 

কেমন আছেন নিখিলেশ?

দরজার বাইরে পা রাখতেই জিজ্ঞেস করলেন এক অচেনা ভদ্রলোক। নিখিলেশ একবার ভালো করে তাকালেন জিজ্ঞাসুর দিকে। সাধারণ মধ্যবিত্ত চেহারা। একটা টি শার্ট আর প্যান্ট। নিখিলেশেরই সমবয়সী মনে হয়।

সব ঠিকঠাক? নিখিলেশের মাপা দৃষ্টির উত্তরে আবার জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলোক।

এইসব খেজুর প্রশ্নগুলো ঠিক সহ্য করতে পারেন না নিখিলেশ। অপিসের বাইরে এইসব কেউ জিজ্ঞেস করলে চড়িয়ে দিতে ইচ্ছে করে। প্রথম দর্শনেই সেটা বাড়াবাড়ি হয়ে যেতে পারে ভেবে অমোঘ উত্তরখানাই দিলেন – এই চলছে!

চললেন কোথায়?

আবার একখান ফাউল কোয়েশ্চেন! বেলা সাড়ে দশটার সময় চানকরে সেজেগুজে সোমত্ত পুরুষ কোথায় যায়? কোথায় যেতে পারে? ভাবলেন বলি- অশত্থের কাছে যাচ্চি। আপনার কাছে একগাছা স্পেয়ার দড়ি হবে?

আপনাকে তো ঠিক – বলটা ওনার কোর্টেই ঠেলে দিলেন নিখিলেশ।

চিনলেন না তো! চিনবেন কী করে। মানুষ নিজেকে চিনে উঠতে পারে সারাজীবনে? আর চেনার অত আছেই বা কী! সবই সেই ঘুঁটের এপিঠ আর ওপিঠ। মানুষও সেই নুড়ি পাথরের মত বুঝলেন কিনা। বাইরে যত রঙবেরঙ খেলা। ভিতরপানে সবই সমান! এক খিদে, একইরকম চুলকুনি। খ্যাক খ্যাক করে হাসতে লাগলেন ভদ্রলোক।

আরে, দাঁড়িয়ে পড়লেন কেন? চলুন। আপনার লেট হয়ে যাচ্চে না? নিখিলেশ থতমত খেয়ে এগোতেই সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে লাগলেন ভদ্রলোক।

নিখিলেশ মনে মনে ভাবছেন, এর মত টাক কার কার ছিলো? যতীনের কাকা। উকিলের পরিচিত কেউ। গোবিন্দ ডাক্তারের ভাড়াটে। কারো সঙ্গেই মিলছে না। সামনের বাড়ির দুদশক আগে হারিয়ে যাওয়া বড়ছেলের কথা পর্যন্ত ভেবে খান্ত দিলেন নিখিলেশ। নাহ। মিলছে না।

বাসে ওঠার আগে মোড়ের চায়ের দোকানে চা খাওয়া অভ্যেস নিখিলেশের। আজ খাবেন কিনা ভাবছিলেন। চায়ের দোকানের সামনে আসতে উনিই বললেন – এককাপ হবে নাকি? সময় আছে?


 

তারপর আরো একটা দিন, তারপর আরো একটা, তারপর একটা, আরো একটা তার পরেও। তারা গোনার মত মনে হয় নিখিলেশের। খুব যে কিছু বুঝতে পারেন তা নয়। কিন্তু ওই গোনার নেশায় দিন কেটে যায়। জীবন কাটে। কোন লক্ষ্য নেই নিখিলেশের। গন্তব্য নেই কিছু। সঞ্চয় নেই। ইন্সিওরেন্স নেই।

অনেকগুলো ক্যানভাস আছে। কিছু রঙ। তুলি আছে। আঁকিবুকি আছে। ছবি নেই কোন।

নিখিলেশ খুব হিসেব করে দেখেছেন জীবনে কোন কাজই পুরোপুরি সম্পুর্ণ হয় না। একটা অর্ধেক জীবন যাপন করে মানুষ। আর বাকি অর্ধেকের জন্য করে হাহুতাশ। মালকোষের মত। পাঁচটা স্বর আছে। দুটো নেই। সারাটা জীবন মালকোষ ঋষভ আর পঞ্চমের জন্য হাহুতাশ করে গেলো। উকিল বলেন কে বল্লে মালকোষে ঋষভ আর পঞ্চম নেই?আছে, ওরা আছে। কেবল শোনা যায় না।

উকিলের সবতাতেই উল্টো কথা। যা নেই তা যদি থাকে তাহলে যা আছে তা কি নেই? কোমল নিষাদের মোচড় দিয়ে ওঠাটাকি তাহলে মিথ্যে?

অল্পবয়সে নিখিলেশ একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলেন। তারপর পাতা ঝরার দিন মেয়েটি যে কোথায় হারিয়ে গেল! সে কি আছে না নেই? বাঁকাধে তিল ছিলো ছোট্ট। তিলটা আছে?তিল তো থাকেই মনে হয়।

নিখিলেশের সমস্যা হল একটা কথা মাথায় ঢুকলে আর কিছুতেই বেরোতে চায় না। উকিলের মতে এ হল সমস্যাবিলাসিতা। হৃদয় খুঁড়ে যন্ত্রণা না জাগাতে পারলে মানুষের জীবনটা আলুনি লাগে।

কিন্তু সে বিলাসিতা হোক আর যাই হোক, নিখিলেশের ভারি সন্দেহ হতে লাগলো ! দিন যায়, আর নিখিলেশের গায়ের রঙ বদলে যায়। কোনটা যে আসল নিখিলেশ নিজেই ঠাওর করে উঠতে পারেন না। ধীরে ধীরে আদৌ আসল নিখিলেশ বলে কিছু হয় কিনা সে বিষয়ে সন্দেহ হতে লাগলো। নিখিলেশ আছেন না নিখিলেশ নেই সেইটেই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ালো।

তারপর একদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখলেন ঝাপসা। রাতে শোবার আগে আয়নায় নিজেকে একবার দেখা অনেকদিনের অভ্যাস। ঠিক করে রাখলেন সকালে উঠে আয়নাটা মুছতে হবে ভালো করে।

নিখিলেশ ক্রমশঃ বিভিন্ন মানুষ হয়ে পড়তে লাগলেন। অফিস যাওয়ার পথে চায়ের দোকানের ছেলেটাকে একদিন বলে বসলেন,  মাল্লু তো ভালোই কামাচ্ছিস বে –তা স্টেপনির ফুটোয় না ঢেলে কিছু জমা!

উকিলের সঙ্গে এসব আলোচনা বিশেষ করা যায় না। আগডুম বাগডুম বলতে থাকেন। সেদিন বললেন ঈশোপনিষদ পড়ুন নিখিলেশ। আপনার জ্যোতিঃদর্শন হয়ে যেতে পারে শিগগিরি! সময় হয়ে এসেছে প্রায়। সময় থাকতে থাকতে এইবার একখান উইল করে ফেলুন।

নিখিলেশ হাসলেন। বললেন, বাতিল ঘোড়ার ইচ্ছাপত্র হয় না মশাই। এমন লাগসই উত্তর উকিলকে বহুদিন দেননি নিখিলেশ!

সকালে উঠে দেখেন আয়নাটায় চিড় ধরেছে যেন


 

আজ সকালে উঠে দাড়ি কাটতে গিয়ে ভারি মুশকিলে পড়লেন নিখিলেশ। বেসিনের পাইপটা জ্যাম হয়ে গিয়ে জল নামছে না ঠিকঠাক! মহা জ্বালা। নিখিলেশ তো মিস্ত্রিদের চেনেন না ভালো করে।

এবার জ্বরের পরে নিখিলেশের আরো কয়েকটা গোঁফ দাড়ি পেকে গ্যাছে। আয়না ধরলে কিছুতেই দেখা যায় না। নিখিলেশ কিন্তু বুঝতে পারেন ঠিক। আর একবার বুঝে ফেললে আর সাদা দাড়ি নিয়ে বাইরে বেরোনো যায়?

নিখিলেশ জানলার ধারে এসে দ্যাখেন কর্মব্যস্ততা। দ্যাখেন আর ভাবেন রাস্তার মোড়ের পাগলটাই বুঝি সবচ্যে সুখি। তার দাড়ি কামানোর চিন্তা নেই। সব্বাইবাংলার পাঁচের মত মুখ করে কাজে বেরিয়েছে। সবার গায়ে হলুদ রঙের জামা। পাগলদের হলুদ জামা পরার নিয়ম নেই। একটা লোক ঝুড়ি ভরে ময়লা তুলে লোহার সিঁড়ি ব্যেয়ে উঠে ট্রাকে ফেলছে। এই লোকটার গেঞ্জিখানা দেখি আকাশি নীল। তাতে ময়লার ছোপ ছোপ নকশা। একটা কলাই করা গামলা উল্টিয়ে মাথায় দিয়েছে। মাথার ওপর উল্টো গামলা। তার ওপর ঝুড়ি। তার ওপর ময়লা। তার ওপর আকাশ। আকাশের গায়ে বাসি তরকারির হলুদ ছোপ। নিখিলেশ এতদিন ভাবতেন রাস্তার মোড়ের পাগলটাই বুঝি সবচ্যে পাগল। ময়লা কি শেষ হয় কক্ষনও? উকিলকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে নিখিলেশ ভাবলেন আয়নাটা পাল্টানো দরকার এবার। সাদা কালোর তফাৎ বোঝা যায় এমন একটা আয়না কিনতে হবে। আচ্ছা, অন্যেরা কি নিখিলেশের পাকা দাড়ি দেখতে পায়? তাদের আয়নায় কি সাদা কালোর আলাদা রঙ? উকিলকে জিজ্ঞেস করলে বলতো – ওহে ভায়া, সাদা কালো বলে আলাদা কিছু হয় না। সবই আসলে হলুদ।

নিখিলেশ ঠিক করলেন আজ আর দাড়ি কামাবেন না। তারপর রান্নাঘর থেকে সাঁড়াশি নিয়ে এসে বেসিনের তলার পাইপটাকে ঠুকতে লাগলেন।

তখন ভোর চারটে আট।

বেশ সময় নিয়ে জামা বেছেছেন নিখিলেশ। বেতস হলুদ পাঞ্জাবি। এটা ওটা সরিয়ে গুছিয়ে একখান আকাশী নীল জিন্স বেছেছেন। বয়স তো মনে। নিখিলেশের ওই একখানাই ব্র‍্যাণ্ডেড জিন্স। ঠিক যেমন করে লোকে বেড়াতে যায়, তেমন করেই বেছেছেন। ক্যাসুয়াল ওয়াচ না স্পোর্টস ওয়াচ মানাবে সেই নিয়ে দোটানায় পড়লেন খানিক। ঠিক ক্যাসুয়াল না স্পোর্টি হচ্চে সজ্জাখানা সেই তো বুঝে উঠতে পারছেন না। একটু সমুদ্রদোলের পর স্পোর্টস এর দিকেই পাল্লা ঝুঁকলো। শালা পুরো জীবনটাই তো স্পোর্টস!

বলেই জিভ কাটলেন নিখিলেশ। ইস। তিনি তো ‘শালা’ উচ্চারণ করেন না। সংযমের মাপকাটি এক্কেবারে।

গোল্ডফ্লেকের প্যাকেটটা নিলেন। দেশলাই নিতে গিয়ে দেখেন চারটে মাত্র কাঠি। বাক্স খুলে নতুন দেশলাই বার করলেন।

মনে করে প্যান্টের চেন আটকালেন। মোবাইল নিয়েছেন। ইয়ারফোন। ডিও দেওয়া হয়েচে। রুমাল। সাদা মোজা টা নিলেন।

মানিব্যাগটা রইলো।

দরজার ল্যাচটা বাইরে থেকে টেনে বন্ধ করলে বড়ো শব্দ হয়। মনে করে চাবিটা নিলেন নিখিলেশ। বাইরে থেকে দরজা টেনে চাবি ঘুরিয়ে নিঃশব্দে দরজা বন্ধ করলেন নিখিলেশ। ঘুমোচ্ছে সবাই। থাক।

নিখিলেশ বেরোলেন…..

~0~

Admin Team

Saptarshi is a self-taught multi-discipline performer with major focus on fine art Photography. He brings his legacy of aesthetic experience from painting, music, literature and theatrics. He is working on Photography as visual art form for over a decade. He specializes both in technical and aesthetic aspects of Photography. Saptarshi worked as Human Resource Manager in a reputed multinational for 12 years before he stepped into Photography mentoring as full time profession in 2016. He has worked as HOD of Film & Photography division at Indian Institute of Digital Art and Animation. He also works as offcial mentor for Tamron, a leading lens manufacturer. He loves to explore new horizons and lifestyles which is a keynote to his photography works as well.